একগুচ্ছ বহিরাগত ফুলের প্রস্থান-01

একগুচ্ছ বহিরাগত ফুলের প্রস্থান | মারুফ কামরুল

ঈশ্বরকে মুখামুখি রেখে..

রাত কতো, সেটা ঠিক বলতে পারি না। চাঁদের অবস্থান দেখে কিছুটা অনুমান করা যায়, খুব সম্ভবত বারোটা পেরিয়েছে। মাঝে মাঝে পাখিদের ডাকেও বুঝে নিতে হয় রাত-ঘড়ির হিসাব। এ সময়ে আমি চুপচাপ হেঁটে বেড়াই। সারাদিনে এতো শান্ত মুহূর্ত আর মেলে না। আজও বেরিয়েছি। মাঝে মাঝে যে ঘনতর শ্বাস শুনতাম আজ সেরকমটা নয়, ক্ষাণিকটা তীব্র। নতুন কোনো রহস্য মনেহচ্ছে।

পরিবেশের এমন নিরবতায়ও আমার কানে ভেসে আসতো ঘনতর শ্বাস। দিনেদিনে এই শ্বাসের উৎস খোঁজা আমার নেশায় পরিণত হয়। আমি হাঁটি আর ভাবি, ভাবি আর খুঁজি। এক সময় মনেহতো ঈশ্বর এ সময়টায় সব হিশাব চুকিয়ে ঝিমিয়ে পড়েন স্বআসনে। তাই নিজেকে আরো একা এবং সুন্দর ভাবতাম। কিন্তু শ্বাসের শব্দ কোথা হতে আসে! এটা মানুষের শ্বাস নয়। হুট করে মনেপড়লো ঈশ্বরীয় কিতাবে বলা আছে তিনি ঘুমান না এমনকি ঝিমানও না। এবং কেনো জানি এই আয়াতে আমার বিশ্বাস হলো। তাহলে তিনি নিশ্চয় আমার প্রেমের বিষয়টা জানেন, দেখেন এবং হাসেন।

আমি হাঁটতে হাঁটতে প্রায় কলা ভবনের কাছাকাছি চলে এসেছি। এখানে আমার প্রেমিকা থাকে। প্রেমিকার গল্প পরে বলছি।

যেটা বলছিলাম, ঐযে ঘনতর শ্বাসের কথা। একদিন এর সন্ধান পেয়ে গেলাম। ঠিক এসময়টাতে আমি হাঁটছিলাম কোনো এক পৌষের রাতে। হাঁটতে হাঁটতে প্রেমিকার কাছে গেলাম। ফুল দিয়ে প্রেম নিবেদন করলাম। মুখবন্ধ করে কিছু কথা আমরা প্রায়ই বলি, আজও সেভাবে কিছু কথা হলো আমাদের। এরপর প্রেমিকার পা’য়ে চুমু খেয়ে বসে রইলাম পাদদেশে। অদূরে শুয়ে আছে কুকুর ছানা। কুকুর ছানাকে জড়িয়ে মানব শিশু। বস্ত্রের তোয়াক্কা না করে ঘুমের দেশে হারিয়ে গেছে। অথচ শীতের প্রকোপে শরীরের সব লোম দাঁড়িয়ে। আমার ভেতরে প্রভুময়তা জেগে উঠলো। গা’য়ের শাল খুলে কুকুরের-মানুষের প্রজন্মকে উষ্ণতায় ঢেকে দিলাম। আরো সামনে হাঁটতে লাগলাম, দেখি আরো কতো মানব পড়ে আছে। শীতকে হারিয়ে এরা বিজয়ী ভঙ্গিতে ঘুমোচ্ছে। এটা দেখে আমার প্রভুময়তা কেটে গেলো এই ভেবে যে, একটা শাল ক’জনকে দেয়া যায়! আমিও প্রচুর শীত অনুভব করছি এবং ঠুরঠুরিয়ে কাঁপছি। হঠাৎ আমার কানে হাসির ধমক এলো। আমি নিশ্চিত আমার কাঁপুনি দেখে কেউ হেসে উঠেছে। নিশ্চিত করে এটাও বলা যায় এ হাসি ঈশ্বরের। তিনি ছাড়া আর কে জেগে থাকতে পারে এসময়! যাক, সে ভাবনা আলাদা রেখে একটি বেঞ্চিতে চুপচাপ বসে রইলাম। ক্ষাণিক বাদে ঝিমুনি অনুভব হলো। ধীরে ধীরে জেগে থাকা আর ঘুমঘোরের মধ্যবর্তী সময়ে পৌঁছালাম। আমার কানে সেই পুরনো শ্বাস আঘাত হানছে। একটু এদিকওদিক করতে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঈশ্বর। চোখের কোণে জল। অনবরত শ্বাস ছেড়ে যাচ্ছেন। মুখ দেখে বুঝা যায়, ক্ষাণিক আগেই তিনি হেসেছিলেন। এখন এতো বিষণ্ন কেনো! হুট করে প্রশ্ন করে বসলাম, আপনাকে বিষণ্ন দেখাচ্ছে কেনো? তিনি বললেন, শুনরে ক্ষ্যাপা। এ বলে আলাপ শুরু হলো। আমার ধারণা মুসা নবীর চেয়ে কম প্রশ্ন করিনি। আলাপের এক পর্যায়ে জানতে পারলাম ঘনতর শ্বাসের গল্প। এটা ঈশ্বরের বেদনার্ত শ্বাস। ঐ যে উদ্বাস্তু মানুষ, জীব এদের করুণ দশা দেখে তিনি এমন শ্বাস ছাড়েন। সব হিসাব চুকিয়ে গেলেও এদের হিসাব চুকায় না। এটা শুনে আমার মনে একটা প্রশ্ন জেগেছিলো, তা অবশ্য ঈশ্বরকে বলিনি, কারণ তিনি মনও পড়তে জানেন। প্রশ্নটা হলো, ওনার দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ার প্রয়োজনটা কী! চাইলেই তো এদের জন্য সুব্যবস্থা করতে পারেন। প্রশ্নটা চেপে যেতে চাইলাম। ঠিক তখনই কোরিটির ভেতরে একটা উত্তর এলো- দুনিয়া ভালোদের জন্য জেলখানা আর মন্দের জন্য স্বর্গ। তখন ঈশ্বরকে একজন অসহায় পরিচালক মনেহলো। যিনি স্ক্রিপ্টের বাইরে একটি লাইনও বলতে পারেন না। স্ক্রিপ্টে লেখা আছে এরা কষ্টে থাকবে এবং সেটাই স্ক্রিনপ্লে হচ্ছে। আর আজব ব্যাপার এসব মানুষ আর জীবজগত কত নিপুণ অভিনয় করে যাচ্ছে পেশার খাতিরে। ঈশ্বর শুধু স্ক্রিপ্টের করুণ গল্প আর অভিনয় দেখে অসহায়ের মতো শ্বাস ছেড়ে যাচ্ছেন। অথচ গল্প, চিত্রনাট্য এবং পরিচালক খোদ ঈশ্বর।

এক পর্যায়ে গল্পের ভিলেনের দেখা পেলাম। বাহ, বেশ চমৎকার। আরাম করে ঘুমোচ্ছেন। কোনো চিন্তার রেখা নেই। আপনি যেমন ভাবছেন, ভিলেন এমন হয় নাকি! আমিও তেমনটাই ভেবেছিলাম। তখনই ঈশ্বর আমাকে উঁচু দালানের দিকে ইশারা করলেন। আমিও তাকালাম, দেখি মিটিমিটি বাতি জ্বলছে। মানুষের নড়াচড়া বুঝা যাচ্ছে। চিনতে বাকি রইলো না, এরাই পুঁজি করে চলছে মানুষের জীবন-সময়-অর্থ। পৃথিবীর সবগুলো। ঈশ্বর বললেন, ক্ষ্যাপা, এরা ভিলেনের প্রতিনিধি। রাত জেগে সব কুকর্ম সেরে নিচ্ছে। ভিলেনের প্রচুর বিশ্বাস ওদের উপর। ওরা কাজে ফাঁকি দেয় না। এজন্য ভিলেন আয়েশি ঘুম দিচ্ছে। আর তুই যাদের শরীরে শাল জড়িয়ে দিলি তারা আমার প্রতিনিধি। দেখ, কতো আয়েশ করে ঘুমোচ্ছে। এই ঘুমের পাহারা দিতেই জেগে থাকি। তোর যে প্রভুময়তা জেগেছিলো, সেটা আমারই ছায়া। যে হাসির শব্দ শুনেছিস, সেটা আমারই, সেটা ঘুমন্ত সকল নিপিড়িতদের।

সেদিন থেকে এসময়টাতে আমাদের কথা হয়। ঈশ্বরের সাথে আমার আলাপ, এটা একান্ত চুপচাপ বিষয়। আমি মূলত বেরুই আমার প্রেমিকাকে দেখা দিতে। সেও এক বিস্ময়কর প্রেম। অপরাজেয় বাংলার সে হাসিনা আহমেদ আমার প্রেমিকা। ইট পাথরের নারী। কী দীপ্ত সাহসী বেসে বুক উঁচা করে দাঁড়িয়ে আছে! যেনো বুকের ভেতর আগুন জ্বলে। সব বিপ্লব, বাদ-মতবাদ শুরু হয় আমার প্রেমিকার পাদদেশে চুমু খেয়ে। যার কোমরে অফুরাণ বল। বুকে ঠাসা বারুদ বায়ু। এই নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকা প্রেমিকার সাথে নানান বিষয়ে কথা হয়। এই মধ্যরাতের জন্য অপেক্ষায় থাকে পাথুরে হাসিনা আহমেদ। এ সময় তার প্রেমিক এসে ফুল হাতে দাঁড়ায়। সাহসী বুকে তাকিয়ে থেকে তৃষ্ণা মেটায়। এটা ও বিশ্বাস করে। আর আমিও সত্যি সত্যি হাসিনার প্রেমে মজে গেছি। এমনকি মাঝে মাঝে আমার বোনকে এনে দেখাই আমার মূর্ত প্রেমিকাকে। কেমন কঠিন করে বাঁধাই করা বুক। সব নোংরা মাথা ঠুকে পড়ে রয় এই কঠিনের আঘাতে। কোমরে বাঁধা শাড়ির আঁচলে শক্তির বারুদ। অসময়ে বিষ্ফোড়িত হয় অন্ধকার হটাতে। বলি, এমন টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে যা বোন। তোকেই দাঁড়াতে হবে। আমার বিশ্বাস একদিন ও দাঁড়িয়ে যাবে।

চলে এলাম কলা ভবনের সামনে।

বেশ কয়েকমাস হলো, কলা ভবনের সামনে কৃত্রিম পুকুর তৈরা করা হয়েছে। পুকুরের জলরাশিতে হেসে খেলে জীবন যাপন করছে পদ্মফুল। প্রেমিকার পাশাপাশি পদ্মফুলের সাথেও এখন গল্প জমেছে। শান্ত পানির পাশে বসে ওদের সাথে গল্প করি। কোলাহলমুক্ত প্রেম করার গৌরব আমার বহুদিনের। পদ্মপুকুর সে প্রেমে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

সোজা পদ্মপুকুরের পাড়ে গিয়ে বসলাম। সবকিছু কেমন অন্যরকম লাগছে। বাতাস নেই, পানির নড়নচড়ন নেই। পদ্মগুলো হাসছে না। এমন একটা অবস্থা পদ্মফুলের, যেনো কেউ গলা টিপে দিয়েছে- মরে যেতে যেতেও যায় নি, হেলে পড়ে যাওয়ার রাস্তায় গিয়েও যায়নি। ওদের এমন বিমর্ষ কেনো দেখাচ্ছে, আমার বুঝে আসছে না। কিছুটা বিরক্তি ভর করতে সবে করছে তখনই কানে ভেসে এলো ঈশ্বরের ঘনতর শ্বাস। আজ শব্দের মাত্রা কিছুটা বেশি মনেহলো। না, মনে হওয়ার কিছু নেই, আজকে তীব্র শব্দ হচ্ছে। আমি গলা চড়া করে ঈশ্বরকে বলতে নিলাম সব এমন কেনো! পদ্মফুলের কী হলো? আপনার বেদনা-ই-বা কেনো মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে? বলেছি কিন্তু গলার স্বর চড়া করতে পারিনি। নিচু গলায় বলেছি। ঈশ্বর একটু বিরক্ত নিয়ে বললেন, তুই কী খবরের কাগজ উল্টাস না! আমি সোজা উত্তর দিলাম, আপনি এটা জানেন না! আর সব খবর তো আপনার কাছেই পাই। এখন খুলে বলুন। তিনি বললেন, তার আগে বল, আজ পথে কোনো কুকুর দেখেছিস?

না তো!

কোনো মানব শিশু কিংবা পাগলকে দেখিছিস এই এলাকায় ঘুমিয়ে থাকতে?

দেখিনি

আচ্ছা একটাও মসা তোকে কামড় দিয়েছে?

না তো, দেয় নি! আচ্ছা কথা না পেঁচিয়ে বলুন তো, কী হয়েছে আজ?

ঈশ্বর বললেন, বলছি। মসা, মাছি, কুকুর, পথ শিশু, পাগল আর আমার ঘুম কামুক প্রতিনিধিরা কেউ নেই এখানে। সব চলে গেছে।

আমি চটে গিয়ে বললাম, বনিতা না করে খুলে বলুন। কেনো চলে গেলো? কোথায় গেলো? আজ আপনার সাথে কথা বলাই ভুল হয়েছে। প্রেমিকার সাথে দেখা করার সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। বলুন, দ্রুত বলুন।

মুখভার করে বললেন, তোর প্রেমিকা তো চলে যাওয়ার আয়োজন করেছে। কেউ থাকবে না এখানে। বহিরাগত কারোর স্থান নেই। আজকে পত্রিকা উল্টালেও আমাকে এমন জ্বালাতিস না!

এটাও আপনার স্ক্রিপ্টে লেখা আছে? অন্তত এটুক বাদ দেন স্ক্রিপ্ট থেকে। খাম খেয়ালি বন্ধ করলে হয় না!

ক্ষ্যাপা, কিছু স্ক্রিপ্ট ডেভিলের কাছে। আমি তখন গল্পের প্লটে অসহায় হয়ে ঘনতর শ্বাস ছাড়ি। আজ যে তীব্র শব্দ শুনলি সেটা শ্বাসের। চলে যাওয়া সবাই আমার প্রতিনিধি। ওরা অভিনয়ের মাঠে অভিনয় করে বেড়াচ্ছে দুঃখ কষ্ট সয়ে। আর আমার শ্বাস ঘনতর হচ্ছে। একটু বাদে তোকেও যেতে হবে।

আমি হতবিহ্বল হয়ে বসে আছি। ঈশ্বর বললেন, কিরে, তোর প্রেমিকার সাথে দেখা করবি না! চলে যাচ্ছে তো!

আমি ব্যস্ততা চোখে পেছনে তাকালাম। দেখি হাসিনা আহমেদ কানে পদ্মফুল গুঁজে শাড়ি উড়িয়ে ছুটে চলছে। হনহনিয়ে ছুটেছে ওর সাথে থাকা দুজন বীর পুরুষ বদরুল আলম বেনু ও সৈয়দ হামিদ মকসুদ ফজলেও। পেছনে লাফিয়ে চলছে পদ্মদল। পদ্মপুকুরে তাঁকিয়ে দেখি একটি পদ্মও নেই। একফোঁটা জলও নেই পুকুরে। আমি দৌড়ে ছুটলাম ওদের দিকে। হাসিনা বারবার আমার দিকে চায়। একটু এগুতেই দেখি মসা, মাছি, কুকুর, পথ শিশু, পাগল আর ঈশ্বরের ঘুম কামুক প্রতিনিধিরা শাহবাগ পেরিয়ে গেছে। বিশাল বহর এগিয়ে চলছে। এর পেছনে প্রেমিকা আর পদ্মদল, যুক্ত হয়েছে রাজুর পুরো টীম। ঈশ্বরের বেদনা-শ্বাস আমার কানে বিঁধে যাচ্ছে। আমি ছুটছি প্রেমিকার দিকে, সমবেত প্রাণীদের দিকে এবং একটি সোনালি ভোরের দিকে। ওদের মিছিলে মিশে যেতে পারলে শুরু হবে নতুন গল্প, নতুন চিত্রনাট্য।

  • 12
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    12
    Shares

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »