মুদ্রিত কাগজের বয়ান

মুদ্রিত কাগজের বয়ান || মারুফ কামরুল

মুদ্রণ-যন্ত্রের নির্যাতন সয়ে এই ভূখণ্ডে আমার আবির্ভাব। মানুষের গল্প বলতে এসেছি।

ফেব্রুয়ারির মেলাকে কেন্দ্র করে মানুষের ঘরে ঘরে চলে গেলাম খুব দ্রুত। অনেকেই আমার গল্প শুনতে আগ্রহী নয় কিংবা তাদের সময় নেই। ঘরভেদে আমার অবস্থান। কারো শেলফের সৌন্দর্য বৃদ্ধির দায়িত্ব আবার কারোর টেবিলে অযত্নে পড়ে থাকা আমার কাজ। গৃহকর্মীরা ঝাড়ামোছা করতে মাঝেসাঝে আমাকে হাতে নেয়। তাদের হাত খুব ধারালো। আমি চাই তারা গল্প শুনুক, আমার গল্পগুলো তাদের নিয়েই তো! কে শুনে কার কথা। আমাকে রেখে দিয়ে ঘর মোছার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আমি অপলক তাকিয়ে কর্মদৃশ্যের আনন্দ উপভোগ করি।

ভিন্ন কিসিমের মানুষও আছে। এদের কাছে অগোছালোভাবেই থাকি। কখনো টেবিলে, কখনো সিথানে। ঘুমানোর সময় আমাকে হাতে নিয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। এদের সঙ্গ আমার বেশ পছন্দ। আমাকে বুকে নিয়ে সারা শহর ঘুরে বেড়ায়। রোদে একসাথে ঘামি, বৃষ্টিতেও ভিজতে চাই, ভিজতে দেয় না, আগলে রাখে। থেকে থেকে রাজনীতির গল্প শুনি, প্রেমের গল্প শুনি।

এক বাসার গল্প বলি। অবসর বসে থেকে প্রায় ঘুমিয়ে পড়ার অবস্থা। শরীরে ধুলোর আস্তর পড়ে গেছে। গিন্নির কান্নার শব্দে কানখাড়া করলাম। সাহেব ফেমিনিস্ট। নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলে কেবলই বাসায় ফিরলেন। টেবিলে ভাত না পেয়ে গিন্নিকে গরম কথা শোনালেন। অমনি গিন্নির কান্না শুরু। কান্না থামাতেই সাহেব দিলেন দুটো কিল। সাহেব বাতি নিভিয়ে ঘুমাতে গেলেন। পাশের ঘরেই সাহেব-গিন্নি ঘুমান। রাত বাড়ার সাথে গোঙানির শব্দ কানে এলো। ভাবলাম গিন্নি এখনো কাঁদছে। পরে বুঝলাম এটা কান্নার শব্দ নয়, মানুষ বানানো যন্ত্রের সঞ্চালন। তারা আমার গল্প না শুনলেও আমি নিরুপায় হয়ে তাদের গল্প শুনি।

ভিন্ন এক গল্প। ঝিকমিকে কাগজে মুড়ে এক বালিকার কক্ষে প্রবেশ করি। খুব যতনে আবরণ মুক্ত করে কোমল হাতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে। নিজেকে তখন নরম করে তুলতে ইচ্ছে হলো। বালিকা গল্প শুনতে আগ্রহী। চারপাশ স্তব্ধ। আমি আর বালিকা মুখোমুখি। গল্প বলছি আর বালিকা শুনছে। বালিকার বুকের খুব কাছাকাছি চলে এসেছি। চোখের কোণে পানি। বুকের ভেতর ঝড়ের আওয়াজ! আমার গল্প শুনে বালিকার চোখে জল আর বুকে ঝড়, দেখতে অসহায় লাগছে। এখন ভয় হচ্ছে, যদি নিষ্ঠুর ভেবে দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু সেটা না হয়ে, হলো মহাভয়ের কাজ। বালিকা গল্প শোনা বন্ধ করে আমাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে। মৃদু সুড়সুড়ি লাগছে। দ্রুত উঠানামারত বুকে স্থির থাকতে পারছি না। ক্রমেই কোমল মাংসে হারিয়ে যাচ্ছি আর ঝড়ের আওয়াজে বিলীন হওয়ার দশা। উঠতি বালিকার বুকে এতো ঝড়, এতো বিদ্যুৎ থাকে, জানতাম না। ঘনঘন নিশ্বাসের সাথে গলগলিয়ে গরম হাওয়া বেরিয়ে আসছে। আমার বিশ্বাস, মনুষ্য জাতি বালিকার বুকে চলমান ঝড়ের আওয়াজ পায় না। এরা মাংসের নেশায় বিভোর হয়ে থাকে। যেমনটা ফেমিনিস্ট সাহেব। সেই রাত ঘুমন্ত বালিকার বুকের সাথে লেপ্টে থেকে কাটিয়েছি।

সূর্যের আলো চোখে পড়তেই বালিকার ঘুম ভাঙে। বাসি মুখে বালিকাকে কচুরি ফুলের মতো লাগছে। বালিকা একটি চিঠি আমার ভাঁজের ভেতর জমা রাখে। এরপর আমরা একসাথে বটতলায় যাই। এই প্রথম গ্রামের সৌন্দর্য দেখছি, বিচিত্র কাজে ব্যস্ত মনুষ্য জাতি। বটতলায় অপেক্ষা করছি। বালিকা দেখে নিলো জমা দেওয়া চিঠিটা ঠিক আছে কিনা। এক যুবককে আমাদের দিকে আসতে দেখা যাচ্ছে। হুম, বালিকার কাছেই এলো। তারা দু’জনে খুব ঘনিষ্ঠ কথা বলছে। মাঝে মাঝে বালিকা আমার কথাও বলছে। আমাকে যুবকের কাছে রেখে বালিকা বাড়ি পথে চলে যায়। আমার ভেতরটা কেঁপে উঠে। মনে হলো একটি আশ্রম হারালাম।

একটু আড়ালে গিয়ে যুবক আমাকে চুমু খেলো। মুখে তামাক পোড়া গন্ধ। সব সয়ে যুবকের বাড়ি গেলাম। যুবক আমার শরীর থেকে বালিকার মাংসের ঘ্রাণ খুঁজে চলছে। বলে, তোমার স্তনের উষ্ণতা লেগে আছে। পৃষ্ঠার ভাঁজ থেকে চিঠিটা হাতে নিয়ে আমাকে দূরে ফেলে দেয়। খাটের নিচেই কেটে যায় দুদিন। আবার যুবকের সাথে বটতলায় যাই, যুবকও চিঠি জমা দিয়েছে বালিকার মতো। বালিকা আসতেই দু’জনের ঘনিষ্ঠ আলাপ শুরু হয়। খুব কাছাকাছি চলে যায়। ঠোঁটে ঠোঁট স্পর্শ করেছে। চুকচুক শব্দ হচ্ছে। তামাক পোড়া গন্ধের সাথে লেবু পাতার ঘ্রাণ মিলেমিশে একাকার।

আমি এখন বালিকার কক্ষে। একটু স্বস্তি পাচ্ছি। যুবকের জমা রাখা চিঠিটা বের করে পড়ছে। জানি না চিঠিতে কী লেখা আছে। আমার দিকে তাকাচ্ছে না, আমি ঠিক তাকিয়ে আছি। বালিকার চোখের কোণে জল নয় আগুন। চোখ লাল হয়ে যাচ্ছে মাছের কানকোর মত। এতো শুকনো লাল দেখিনি। চিঠি রেখে আমাকে টেনে নিলো। গল্প বলছি, বালিকা শুনছে। আমাকে আরো কাছে নেয়। কম্পমান ঠোঁটের কাছে। গাঢ় চুমু খায়। লেবু পাতার সুবাস ছড়িয়ে পড়ে আমার শরীরে। বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে। বিধ্বস্ত পল্লীর ছবি ভেসে উঠেছে বালিকার মুখে। বুকের ভেতর ঝড় পরবর্তী হাহাকার, কান্না।

দিন তিনেক পর। বালিকা আর আমি মুখোমুখি। ঘরে আর কেউ নেই। দরজায় টোকা পড়লো। বালিকা দরজা খুলে কাউকে ভেতরে ডাকছে। সেই বটতলার যুবকসহ কক্ষে আসে। পরিচিত কথা বলছে দু’জনে। দরজা জানালা বন্ধ করে দিচ্ছে বালিকা। মনুষ্য জাতির জন্মকালিন দৃশ্যের মতো বিবস্ত্র হয়ে যায় দু’জনে। ঠোঁটে ঠোঁট। বুকের উপর হাতের দ্রুত সঞ্চালন। ধীরে ধীরে দুটি দেহ এক হলো। সেই সাহেব-গিন্নির মতো গোঙানির শব্দ। যুবকের ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দ। এরপর তৃপ্তির চিৎকার। খাটের দোলা কমে আসছে। বিদায় কালে বলিকার করুণ অনুরোধ- ‘তবুও কথা রেখো, সবটাই দিলাম।’

আমি খুব নীরবে তাদের গল্প দেখলাম। মানুষের গল্প আমাকে নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে। আমার ভেতর যে গল্প মজুত আছে সেগুলোও মানুষের গল্প। তবে সাজানো মিথ্যাগল্প।

ঘরের বাতি জ্বলতেই ভেসে ওঠে বালিকার বিবর্ণ মুখ। আমাকে কাছে টেনে নেয়। আমার ভেতরে নড়েচড়ে ওঠে। বালিকাকে গল্প শোনানোর সাহস নেই। তবু রাত নামলে বালিকা আমার মুখোমুখি বসে। আমি গল্প বলি।

এরমাঝে তিনদিন বালিকার সাথে বটতলায় যাই। যুবকের জন্য অপেক্ষায় থাকতে দেখি। অপেক্ষায় থাকা বালিকার মুখে এক নদী বিষাদ। মানুষের অপেক্ষার বিষাদ, প্রতীক্ষার ক্লান্তি, এসব গল্প আমার জানা- এসবের চিত্র দেখিনি। সেই চিত্রই গত কয়েকদিন থেকে দেখছি। যুবক যতই দূরে সরে যাচ্ছে বালিকা আমাকে কাছে টানছে। একই গল্প বারবার শুনছে। বোশেখের ঝড় হাওয়া বয়ে চলা বুকের সাথে গেঁথে নিচ্ছে আমাকে। চুমুতে চুমুতে আমার শরীর জুড়ে এখন লেবু পাতার ঘ্রাণ।

আজ আবার বটতলা যাচ্ছি। বিকেলের রোদ পড়তেই বালিকা আমাকে নিয়ে ঘর থেকে বেরুলো। হালকা বাতাস বইছে। মেঘ জমতে শুরু করছে আকাশে। বালিকা অপেক্ষা করছে যুবকের পথ চেয়ে। বট গাছের মতো ধৈর্য্য নিয়ে। আঁধার নেমে আসছে চারপাশে। বাতাসের গতি বাড়ছে। ঝড়! বালিকার বুকের ভেতর। বাইরে কাল বোশেখের ঝড়। ধুলোবালি বাতাসে উড়ছে। মানুষ সব দৌড়াচ্ছে। বালিকা দাঁড়িয়ে, স্থির দাঁড়িয়ে। বটগাছের ডাল ভেঙে পড়ার দশা, সামলাতে পারছে না ঝড়ের গতি। তেমনটি বালিকাও। বিজলির আলোয় কাকে যেনো দেখে, ছুটে যায় বালিকা। দ্রুততার ফলে আমাকে ফেলে যায় বটের গোড়ায়। আমার গল্পের কোথাও লেখা নেই ‘ভালো থেকো’ কথাটি। তাই বালিকাকে বলা হলো না ‘ভালো থেকো’। বৃষ্টি নামে, প্রচণ্ড বৃষ্টি। একটি শব্দের পর আর কোনো শব্দ পাইনি বালিকার, বিজলির আলোতে কোথাও দেখিনি তাকে। আমি, আমার ভেতরে বালিকার চিঠি। ঝড়ের আঘাতে বিদ্ধস্ত পল্লী, ধুয়ে মুছে দেয় বহমান বৃষ্টি।

  • 40
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    40
    Shares

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »