maruf kamrul

শিউলি ফুলের বোঁটাহীন জীবন || মারুফ কামরুল

ভবানীপুর নিতান্তই গ্রাম। নদীর আশীর্বাদে বর্ষাকালে ক্ষুদ্র বাণিজ্য নগর গড়ে উঠে। সাঁঝবাতি জ্বলতে না জ্বলতে দোকান-পাট, রাস্তাঘাট জনশূন্য হয়ে পড়ে। গ্রামের সরু রাস্তা ধরে কয়েকটি বৈদ্যুতিক খুঁটি দেখা গেলেও তাতে বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। ছটাক বা সের খানেক তেলের উপর নির্ভর করেই সন্ধ্যাবাতি জ্বলে। এশার নামাজের আযান শুনলেই রাতের খাবার সেরে ফেলে। বুড়ো-বুড়িরা দুই একটা বাতের বড়ি খাওয়া পর্যন্ত তেলশূন্য সলতেটুকু জ্বলতে থাকে। যাদের ঘরে দুই একটা বাচ্চা প্রাইমারি স্কুলে যাতায়াত করে ,তারা হয়ত অন্যদের চেয়ে একটু বেশি ঘুম চোখে জেগে থাকে। মাস্টারের লেখা শেষ হলে তাদের ঘরের বাতিও নিভে যায়। তখন পুরো গ্রামটা শশ্মানের মতো। কাছাকাছি নিশ্বাসের শব্দও স্পষ্ট হয়ে উঠে। আখক্ষেতের ভিতরে থেকে মাঝে মাঝে শেয়ালের হাঁক ছাড়া আর কিছুই শুনা যায় না । আর কয়েকটা ঝোপ আছে যেখানে জোনাকিরা খেলা করে।

কিন্তু সকাল বেলার ভবানীর পুরোই ভিন্ন। রাতের সব নিরবতা ফজরের আযানের সুরেসুরে ছুটি নেয়। সকাল হলেই মনে হয় এই এক আনন্দ বাজার। কত বিচিত্র মানুষ অথচ একটি সুঁতোয় গাঁথা। সকলে সকলের আত্মীয়।সেই গ্রামের পূর্ব মাথায় বাস করে বৃদ্ধ রহিম মিয়া । গ্রামের দ্বিতীয় শ্রেণির মাতব্বর । মাত্র এক সন্তানের পিতা তিনি। তার স্ত্রী সোনাবানু প্রথম সন্তান প্রসব করার পর সন্তান ধারণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এজন্য কম কথা শুনতে হয়নি। সেদিনও তো বদরু মাতব্বর বলেছিল-‘মাগি এক বিয়ানে বুড়ি হইছে, অলক্ষী যত্তসব!’ কিন্তু সোনাবানু একমাত্র সন্তান শাহেদ আলীর মুখের দিকে তাকিয়ে সব সয়ে গেছে। এখন বয়স হয়েছে। ছেলে বড় হয়েছে।

বেশ কয়েকদিন থেকেই ছেলের রোজগারে সংসার চলছে। শাহেদ আলী কলেজ পার করেই লেখা পড়া ছেড়ে দেয়। গ্রামের একটি কোল্ড-স্টোরের হিসাব রক্ষকের দায়িত্ব পালন করে আসছে বহুদিন থেকে । বাবা মায়ের পছন্দে পাশের গ্রামের অদিতিকে বিয়ে করে। দশ ক্লাস পার করা গ্রামাধুনিক মেয়ে। লাজুক স্বভাবের মেয়েটি দিনে দিনে পাকা সংসারী হয়ে উঠলো। অফিস ফেরত শাহেদ আলীর জন্য লেবুর শরবত তৈরি করতে কখনো ভুল করে না। শ্বশুর-শাশুরি তার কাছে পূজনীয়। তারা বৌমাকে বেসম্ভব রকম ভালোবাসে।

স্বামীর সাথে তার প্রতিটি দিন এবং প্রতিটি রাত যেনো নতুন একটা রহস্য বলয়।গত পরশু দিন বিকালে অদিতি সাঝুগুজু করে বসে বসে ভাবছে, শাহেদ কি তার জন্য আজ ফুল নিয়ে আসবে, যেমনটা প্রায় নিয়ে আসে। আদর করে বলবে, আজ তোমাকে অন্নেক সুন্দর লাগছে। ভাবনা ফুরানোর আগেই সন্ধ্যা নেমেছে। সন্ধ্যা বাতি জ্বালানোর তাগিদে ভাবনায় ছেদ পড়লো।

রাত আটটায় শাহেদ ঘরে এলো। বিদ্যুৎ ছিলো না, মোমবাতির আলোতে বসা অদিতি। মোম বাতির একটি মোহনীয় ক্ষমতা আছে, যার উপর এর আলো ঠিকরে পড়ে সে-ই লোভনীয় হয়ে উঠে। অদিতি অর্ধেক ঘোমটা টেনে বসে আছে, নিজের অতিরিক্ত সাজটুকু তাকে লজ্জার গহ্বরে নিয়ে গেছে। লজ্জায় রক্তিম মুখখানা। কৌতহলী রোমাঞ্চকর ঘামের বিন্দু নাকের ডগায় ভর করেছে। মোমের আলোতে চিকচিক করে প্রতিফলন ছড়াচ্ছে। অদিতি আঁড় চোখে শাহেদের দিকে তাকায়, আবার ঠোঁটের কোনে মুচকি হাসি টেনে চোখ নামিয়ে আনে। অদিতি মনে মনে ভাবছে, আজ কি আমি বেশি সেজেছি? আচ্ছা শাহেদ কিছু বলছে না কেনো! ওর কি পছন্দ হয়নি, এমন চুপচাপ তাকিয়ে কী দেখছে। আবার পরক্ষণেই ভাবছে, দূর ছাই! কীসব আবোল তাবল ভাবছি, ও হয়ত মুগ্ধ হয়েই আমাকে দেখছে। আজ তো সরবতও চাইলো না , আমাকে দেখেই তৃষ্ণা মেটে গেলো না তো! অদিতি এসব ভেবে পুলকিত হচ্ছে। লজ্জায় ঘোমটা টেনে দিলে সামনের দিকে। পিছন থেকে পিঠে হাত বুলানোর আবেশ পেয়ে নড়ে চড়ে বসলো। ভাবনার বলয় থেকে বেরিয়ে এলো। এমন নরম করে হাত বোলানোর অনুভূতিতে অদিতি আরো কোমল হয়ে গেলো। পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে শাহেদ বলছিল, লাজুক বউ আমার , পরীরা সব বিদায় নিয়েছে তোমায় দেখে। ঘোমটাটা সরাও না.. দেখি একটু, মনভরে দেখি। জানো অদিতি, বিধাতা খুব কম মানুষকেই এমন সুন্দর মুখের পূজারী বানায়। পবিত্র অবয়বের প্রতি দৃষ্টি রাখলে নিজের ভেতরটা যেনো পবিত্র হয়ে উঠে।

এই পৃথিবীর প্রতিটি জিনিসের জ্বালানি শক্তি থাকে, নারীদের জ্বালানি শক্তি হলো প্রশংসার গোলাপ জল। অদিতি আপাদমস্তক একজন নারী। শাহেদের মুখে প্রশংসা আর মুগ্ধতা শুনে ভেতরটায় যেনো আনন্দের ঝড় বয়ে চলছে। উপছে পড়া যৌবনটা যেনো আরো বেশি জ্যোতিময় হয়ে ওঠলো। তবে প্রশংসাটা কিঞ্চিতও বাড়িয়ে বলা নয়। সত্যি এমন সুন্দর অবয়ব বিধাতা সবাইকে দেয় না। ফর্সা যেটা অদিতি সেটা নয়, তবে মোহনীয় যেটা অদিতি তারচে বেশি। এই ছোট্ট চেহারাতে এমন কিছু আছে যা দেখে যে কোনো যুবক আযৌবন তাকিয়ে থাকতে পারবে, তবুও চোখের তৃষ্ণা মিটবে না।

পাশের রুম থেকে সোনাবানু ডাক দিলো, কী গো বৌ! ভাত বাড়তে যাও না কেন? খিদায় পেট ছুই ছুই করতেছে। অদিতি লজ্জ্বা পেয়ে গেলো। দ্রুত ঘোমটা টেনে রসুই ঘরে গিয়ে ভাত বাড়তে লাগলো। সে রাতে অদিতি আর শাশুরির চোখে চোখে তাকাতে পারেনি। লজ্জায় সারাক্ষণ মাথা নিচু করে রেখেছিল।

এমন কতশত রোমাঞ্চকর, অস্থির, লাজুক পরিস্থিতি ইতোমধ্যে মোকাবেলা করতে হয়েছে। এই তো সেদিন অদিতি খুব ভোরে গোসল শেষে ভেজা চুলে নীল শাড়ীটা ব্লাউস আর পেটিকোট শুকাতে দিচ্ছিলো। ঠিক তখনই পাশের ঘরের ভাবি টিটকারি মারলো, কী লো! দেওরাটারে বুঝি নাইট ডিউটিতে ব্যস্ত রাহছ! কর, কর, মজা কর, বাচ্চা কাচ্চা অইলে আর সুযোগ পাইবি না। একটানে কথাগুলো বলে সে কলসি কাঁখে চলে গেলো। অদিতি তো ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো। কথাগুলো কানে, মুখে, বুকে তীরের মতো বিঁধে গেলো। বারবার কানের কাছে বাজতে থাকে আর মনের অজান্তে পুলকিত হচ্ছে অদিতি। কথাগুলো তার শরীর জুড়ে সুড়সুড়ি দিয়ে গেলো। একাই একটু মুচকি হেসে ঘরে চলে এলো। কিন্তু সকাল বেলা গোসল করাটা অদিতির ছোট বেলার অভ্যাস। স্কুল ছেড়েছে বেশি দিন হয়নি। তাই প্রতিদিন সকালেই গোসল করে। এই গোসল করাটা যদি আশেপাশের কোনো ভাবির চোখে পড়ে তারা বিভিন্ন দিকে টেনে নিয়ে যায়। এ নিয়ে অদিতি কখনো প্রতিবাদ করে না। বরং ভিতরে ভিতরে হাসে, তাদের ভুল ধারণার কৌতূহল ভাঙে না। তবে আজকের ব্যাপারটা অন্যরকম । আজ অদিতির চেহারার প্রতিফলনটা অন্য দিনের চেয়ে ভিন্ন রকম ছিলো। যেনো একথাগুলোর প্রতিটি পরতে পরতে নারীত্বের সুখ নিহিত।

এমন করে নতুন একটি জুটির দিন অতিবাহিত হচ্ছিল। এর মাঝে কিছু দুঃখও পোহাতে হয়েছে। তার মধ্যে যে বিষয়টা বেশি নাড়া দিয়ে গিয়েছে। বিয়ের ঠিক এক বছরের মাথায় শাহেদের বাবা মারা যায়। শাহেদ প্রায় ভেঙে পড়ে। আনন্দের নদীতে যেন ভাটা পড়েছে। পিতার মৃত্যুতে শাহেদ এলোমেলো হয়ে গেলো। মানসিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়লো। তবুও সংসারের হাল ধরে রেখেছে। তবে তার স্বভাবে এক ধরনের হাবলামি কাজ করা শুরু হয়েছে। এমনকি গ্রামের প্রতিবন্ধি ছেলেটাও তাকে ক্ষেপাতে ভুলে না।

দিনে দিনে সংসারের সুখটা লুকাতে থাকে। একের পর এক দুঃখের পর্দা নেমে আসে। আগে যা কিছু স্বাভাবিক ছিল শাহেদের কাছে তার অনেক কিছুই এখন অস্বাভাবিক। কেমন যেনো চৈত্রের রোদের মত খিটখিটে মেজাজ হয়ে গেছে। আবার নিজেই নিজের খিটখিটে মেজাজের উপর অসন্তুষ্ট হয়ে নিজেকে শাস্তি দেয়। এই তো গতকাল ভরদুপুরে শাহেদ বাসায় ফিরলো, গরমে অস্থির হয়ে গেছে, যেনো ঘামের নদীতে গোসল করে এলো। অদিতি রীতিমত শরবত করে নিয়ে এলো। শাহেদ কোনো কারণ ছাড়াই রেগেমেগে নাজেহাল। অদিতির হাত থেকে গ্লাসটি নিয়ে দূরে ছুড়ে ফেলে দিলো। আর চেঁচিয়ে বলতে লাগলো, ক্ষুধায় আমার জান যায়, মাগি শরবত লয়ে কুয়ারা করতে আইছে। যা ভাত বাড়।

অদিতি কিছুই বলেনি। অবাক হয়ে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। অপমানে চেহারা লাল হয়ে গেলো। চুপচাপ ভাত বাড়তে চলে এলো। কিন্তু শাহেদকে ডাকতে পর্যন্ত সাহস পেলো না। দশ মিনিটের মতো কারো মুখেই কথা সরলো না। শাহেদ পিঁড়ার উপর বসে ভাবতে লাগলো, এ আমি কী করলাম! অদিতি তো খারাপ কিছু করেনি। আমি ওরে তুই তোকারি করে বকছি! ছি! ছি! ওরে মুখ দেখাবো কেমনে ? কী বলে কথা শুরু করবে? ছোট মেয়েটির উপর এমন আচরণ করা ঠিক হয়নি। কিছুক্ষণ পরে ঘরে গিয়ে অদিতিকে করুণ সুরে ডাকতে লাগলো। এ যেনো অল্পক্ষণ আগের শাহেদ আলীর চেয়ে পুরোই ভিন্ন। অদিতি তো এমন শান্ত, নীরব শাহদেকেই খুঁজে চলছে। করুণ সুরে’র কাতর অদিতি শাহেদের মিষ্টি ডাকে বেশিক্ষণ চুপ থাকতে পারেনি। শাহেদ অদিতির প্রতিত্তোর পেয়ে কিছুটা স্বস্তি পেলো কিন্তু নিজেকে ক্ষমা করতে পারেনি। আজ না খেয়ে নিজেকে কষ্ট দিবে বলে প্রতিজ্ঞা করেছে। এটা নিতান্তই ওর পাগলামি। অদিতি এমন অসংখ্য পাগলামি সহ্য করেছে। অদিতির আবদারের কাছে ওর প্রতিজ্ঞা টিকেনি।

অদিতি দিনে দিনে চারপাশে অন্ধকার দেখতে শুরু করলো। শাহেদের এমন অদ্ভুত আচরণ সে নীরবে সয়ে যায়। শাহেদের মাও বৌকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করে। শত বুঝ দিলেও সে বুঝ আমলে নেওয়ার মতো নয়। নব যৌবনা একটি মেয়ে বয়সের দ্বিগুণ একটা পুরুষের পাগলামি সইতে পারে না, এটাই স্বাভাবিক। তবুও অদিতি সয়ে যায়। স্বামীর পদতলে বেহেস্ত জ্ঞান করেই মুখ বুজে সব মেনে নেয়। আবার এটাও তো সত্য, শাহেদ তো এমন বদ মেজাজী ছিলো না।

বছর অতিবাহিত হয়ে গেলো, শাহেদের কোনো উন্নতি নেই। এর মাঝে একটি কন্যা সন্তান জন্মদিলো অদিতি। পরিবারের সবাই খুশি। শত হাবলামির মাঝেও মেয়ে হওয়ার আনন্দে শাহেদ শুক্রবার মিলাদ পড়িয়ে গ্রাম বাসীর মাঝে আমিত্তি বিলিয়েছে।

মেয়েটির নাম রেখেছে অদ্রি। অদ্রির বেড়ে ওঠার সাথে সাথে শাহেদের মানসিক অবস্থারও উন্নতি হচ্ছে। দিনকে দিন সে সুস্থ হয়ে উঠছে। অদিতি তো আনন্দে আত্মাহারা। তার বিগত সুখটুকু চারপাশে ডানা মেলে খেলছে। অদ্রি এখন অল্প অল্প কথা বলতে জানে। বুড়ির এখন আর একা ঘুমাতে হয় না। নাতনি বুকে করে স্বর্গীয় ঘুম দেয়। সারদিন কত যে গল্প নাতীনকে শুনায় তার কোনো ইয়ত্তা নেই।

বৈশাখ মাস চলছে। কখন যে আকাশের কী হয় বলা মুশকিল। এই ভালো, এই ঝড় এমন করে দিন যায়। বৃহস্পতিবার। আকাশে খুব মেঘ জমেছে। এতো ঘুটঘুটে অন্ধকার যেনো বিকাল না হতেই সন্ধ্যা নেমেছে। রাত আটটা বেজে চলছে অথচ এখনো শাহেদ ঘরে ফিরে এলো না। কত বার যে অদিতি চেরাগ জালিয়ে শাহেদেও ফেরার রাস্তা দেখেছে, সারারাতেও ফিরেনি শাহেদ। এই বৃষ্টি ভেজা রাতে শাহেদকে খুব করে কাছে চেয়েছিলো কিন্তু সে আশা পূরণ হয়নি। সারারাত প্রচুর বজ্রপাত আর শিলা বৃষ্টি হয়েছিলো। অদিতি চিন্তায় ঘুমাতে পারেনি। ও কি কোনো কারণে আমার উপর রাগ করলো! এখানো ঘরে এলো না ? কিন্তু রাগ করে রাতে থাকবেই বা কোথায় ? অদিতি এসব ভাবতে ভাবতে সকাল হয়ে গেলো।

সোনাবানু ওঘর থেকে চেঁচিয়ে উঠলো, বৌ মা! ওলো বৌমা! এ আমি স্বপ্নে কী দেখলাম; আমার গলাটা শুকাইয়া আইছে। এক গেলাস পানি দে তো।অদিতি দ্রুতপদে পানি নিয়ে হাজির হলো।বৌমা শাহেদ ঘরে ফিরেছে ? কী গো কতা কওনা কেন ?অদিতির গলা দিয়ে কথা বেরুচ্ছে না খুব কষ্ট করে বললো, না মা, গতরাতে ঘরে ফিরেনি। সোনাবানু আরো দ্বিগুণ অস্থির হয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়ে, কও কী মা! আমার শাহেদের কী অইলো? গত রাইতে এ কী দেখলাম আমি!সোনাবানুর গত রাতের দুঃস্বপ্নটাই মিলে যাচ্ছে। বুড়ি খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লো। উঠানে নেমে ‘আমার শাহেদ কই’ বলে মাটিতে বসে পড়লো। ইতোমধ্যে পাড়া জুড়ে খবর হয়ে গেছে শাহেদ বজ্রঘাতে গতরাতে মারা গেছে। লোকজন খাটিয়া আনতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। মসজিদ থেকে খাটিয়া এনে শাহেদের লাশ নিয়ে ওর বাড়ির পথে হাঁটা ধরেছে। হঠাৎ বাড়ির পাশের মসজিদ থেকে মাইকের শব্দ বেজে উঠে, অদিতি কান খাড়া করে শুনে । এই অসময়ে মাইক থেকে কখনো ভালো খবর শুনা যায় না । এখনো ভালো খবর শুনা যায়নি। মাইক থেকে শাহেদ আলীর মৃত্যুর খবরই ভেসে এলো। অদিতি কিছুতেই তার কানকে মানাতে পারছে না। আবার মাইকের কথাগুলোর দিকে মনোযোগ দিলো, মরহুম রহিম মিয়ার ছেলে শাহেদ আলী… মিনার থেকে তৃতীয় বারের মতো পুনাবৃত্তি হওয়ার পর বুঝতে বাকি থাকে না যে , শাহেদ আর নেই। তবুও অদিতি নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারছে না। সে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চোখ দিয়ে অঝরে পানি ঝরছে। সোনাবানু তো মাটিতে গড়াগড়ি করছে। এরই মধ্যে বিশাল এক জনবহরসহ শাহেদের লাশ আঙিনায় চলে এসেছে। অদিতি দৌড়ে যায়, কে বলেছে শাহেদ মৃত! অদিতিকে দেখই যেনো শাহেদ হাসছে। শাহেদ উঠে আসছে না কেনো ? চুপচাপ দাঁড়িয়ে এসব ভাবছে। একটুও টলছে না, যেনো সব স্বাভাবিক। মনে হচ্ছে এ আর এমন কী! এ যেনো প্রচ- ঝড় সয়ে যাওয়া স্থির দাঁড়ানো বটবৃক্ষের গোঁড়ালি। সোনাবানু এর ফাঁকে দু’বার মুর্ছিত হয়েছেন। তাকে নিয়ে পাড়ার আগুন্তক কিছু মহিলা ব্যস্ত আছে। হাতে পায়ে তেল মালিশ করা, মাথায় পানি দেওয়া। দলে দলে লোকজন ছুটে এলো, জোয়ান বৃদ্ধ প্রায় সকলের মুখে কালেমা পড়ার একটা গুনগুন শব্দে মুখরিত পুরো বাড়ি। মুহূর্তে পরিবেশ জানান দিয়ে গেলো , এটা একটা মৃত বাড়ি। নানান প্রকার কান্নার শব্দে শোকের মাত্রা ঘনীভূত হতে লাগলো।অদিতি পাড়ার মহিলাদের বিনিয়ে বিনিয়ে কান্নার দৃশ্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। কই! অদিতি তো মোটেও কাঁদছে না। পুরো বিষয়টা তার কাছে অজানা রহস্য। তার চোখে এক ফোটা পানিও নাই। অথচ চোখ- মুখ ফুলে ফেঁপে একাকার। পাড়া প্রতিবেশির কাছে এও এক অবাক করা রহস্য। ইতোমধ্যে অনেকে বলাবলি শুরু করেছে, এই ডাইনির তো কোনো দয়া মায়া নাই। আবার কেউ বলছে, ওই মাতারি, তোর চোহে পানি নাই লো। ছিঁ! ছিঁ! আরেক জন পূর্ব জনের কথার প্রতিত্তোর দিয়ে বললো, ওলো বুঝি, ওর চোহে পানি আইবো কইত্তন? শাহেদের মরণে ও খুশিই অইছে, ঐ মাতারি অহন জোয়ান বাতার পাইবো।

যৌবন উচ্ছ্বাসে উচ্ছ্বাসিত মেয়েটিকে আজ কোন সহনীয় ক্ষমতায় কঠোর জালে আটকে রেখেছে, কেউ তা জানে না। এতো এতো তেঁছড়া কথাও তার সহনশীলতার এক বিন্দুও টলাতে পারেনি। সত্যিই কী অদিতির চোখে পানি আসছে না! নাকি পানি শুকিয়ে গেছে? গতরাতে নির্ঘুম চোখে অবিরল গতিতে চুপে চুপে খোঁয়া গেছে অনেক পানি। এই কান্নার শব্দ ছিলো না, ছিলো উত্তাল ঢেউ। বৃষ্টি শব্দের গভীরে হারিয়ে যাওয়া কান্না কেউ দেখিনি, কেউ শুনেনি, এমনকি শাহেদও নয়। শব্দহীন কান্নার মৃদু ঢেউগুলো শুধুই হৃদয়ের পাড়গুলোকে মজবুত করে তোলে সহনশীল অট্টালিকায়। আজ অদিতি একটি সহনশীল অট্টালিকার নাম।

বেলা বারোটা বেজে গেছে, বাঁশ কাটা, কবর খোড়া শেষ। কাফনের কাপড় পরানোর কাজ চলছে।

সেই শরবতের গ্লাসে আজও চিনি আর লেবুর সরবত তৈরি হলো। শাহেদের জন্য নয়, অদিতির জন্য তৈরি হয়েছে এই সান্তনা শরবত। অদিতি সেই আগের মতোই কথা নেই মুখে , নীরবে চেয়ে আছে শরবতের গ্লাসের দিকে। এমন ভাবে চেয়ে আছে , যেনো কোনো বিজ্ঞানী রাসায়নিক বিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছে। যে কারোর সাধারণ দৃষ্টিতে তাই মনে হবে। কিন্তু সে এও তো ভাবতে পারে, শাহেদ কখন আসবে? শরবতে তো গরম হয়ে যাচ্ছে। আজ এতো দেরী হচ্ছে কেনো? জানি না অদিতি কী ভেবেছে, একটু পরেই সে গ্লাসটি হাতে নিয়ে ভিড় ঠেলে সোজা লাশের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। আর গুনগুন করে বলছে, এই! এতো রাগ করলে চলে? এবার উঠে পড়ো তো! প্রতিবার শাহেদের রাগ ভাঙানোর সময় এই কথাগুলোই বলতো অদিতি। ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা শুকনো গাছকে উঁইপোকা কাটলে যেমন অকস্মাৎ পড়ে যায়, তেমনি অদিতি হঠাৎ পড়ে গেলো। লোকজন তাকে ধরাধরি করে ঘরে নিয়ে এলো।

ইমাম সাহেব ঘোষণা দিয়ে নামাজ দাঁড়িয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। সমাজের মাতব্বর সাহেব শাহেদের পক্ষ থেকে সবার কাছে ক্ষমা চাইলেন। নামাজ ও দাফনের কাজ শেষ হলো। সোনাবানুর চিৎকারে যেনো বাড়ি কেঁপে উঠছে। এখনো জ্ঞান ফিরেনি অদিতির। দাঁতে দাঁত আটকে গেছে। ঠিক তাই, চোখের পানি দিয়ে শাহেদের প্রতি তার ভালোবাসা মাপা যায় না। বয়সে দ্বিগুন লোকটাকে অদিতি মনের বেখায়ালেই ভালোবাসে। অদিতির মানিয়ে নেওয়ার বহু প্রসংশা শাহেদ করতো। শাহেদের প্রতি অদিতির ভালোবাসা সংজ্ঞায়িত ভলোবাসা নয়। এ ভালোবাসা জৈবিকতা থেকে পবিত্রতার সেতু। [চলবে]

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »